ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য বড় শহরে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্রধারী ও পেশাদার শুটারদের অপতৎপরতা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। শুটারদের এমন ওপেন টার্গেট কিলিংয়ে নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ভোটের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, এসব অস্ত্রধারীর আচরণ ততই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। একের পর এক নির্ভুল নিশানায় হওয়া এসব হত্যাকাণ্ডে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গত দেড় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ শুটিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসমাগম এবং সড়কে চলন্ত যানবাহনেও ফিল্মি-ধাঁচের ওপেন শুটিংয়ের ঘটনা দেখা গেছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে গোলাগুলির ঘটনায় এরশাদ উল্লাহসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় গণসংযোগে অংশ নেওয়া ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেন বাবলা (৪৩) নিহত হন।
চট্টগ্রামের মতোই ভয়াবহতা দেখা গেছে ঢাকায় যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার ঘটনায়। গত ১৭ নভেম্বর মিরপুরে একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে (৪৭) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
এর আগে গত ১০ নভেম্বর রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রতিপক্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের টার্গেটে পরিণত হয়ে দুই শুটারের কিলিংয়ে প্রাণ হারান আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুন (৫০)।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে সড়কে চলন্ত রিকশায় থাকাকালীন গুলি করে হত্যার চেষ্টা। এই ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই আক্রমণের ফলেই গত ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় রাতে সিঙ্গাপুরে অপারেশনের সময় মৃত্যু হয় ওসমান হাদির।
হাদীকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার একদিন আগে, অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর, পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে আব্দুর রহমান নামের এক মসলা ব্যবসায়ীর দোকানে ঢুকে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও গুলির ঘটনা ঘটেছে। গত ১৮ জুন দিবাগত রাতে ঢাকার পল্টনে এক অভিযানে সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের দুই সদস্য, সহকারী উপ-পরিদর্শক আতিক হাসান ও কনস্টেবল সুজন, গুলিবিদ্ধ হন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এসব হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র আগের তুলনায় অনেক বেশি অত্যাধুনিক। বিশেষ করে নাইন এমএম বোর পিস্তল এবং উন্নত ম্যাগাজিনের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণত পেশাদার খুনি বা প্রশিক্ষিত শুটারদের হাতেই বেশি দেখা যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, এমন পেশাদার ও ভাড়াভিত্তিক বন্দুকধারীরা শুধু অপরাধজগৎ থেকেই উঠে আসছে না, বরং রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকেও অনেকে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত। অর্থনৈতিক স্বার্থে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা অস্ত্র চালাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন গ্যাং ও কিশোর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত অন্তত দুই ডজন দক্ষ শুটারের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানিয়েছে ডিএমপি। জানা গেছে, বর্তমানে ডার্ক ওয়েব বা এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে অস্ত্র ও শুটার ভাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ট্র্যাকিংকে কঠিন করে তুলছে।
এদিকে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আশঙ্কার বিষয় হলো, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এসব লুট হওয়া অস্ত্র দিয়ে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও জানিয়েছে, ভোটের দিন ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই তারা অবৈধ অস্ত্রধারী ও পেশাদার অপরাধীদের তথ্য হালনাগাদ করে তালিকা তৈরি, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং অভিযান চালাচ্ছে। তারা বলছে, এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো-টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী প্রহরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্ত্রধারীদের সক্রিয় থাকা শুধু সাধারণ অপরাধ নয়; এটি নির্বাচনী নিরাপত্তা ও জনসাধারণের বিশ্বাসের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই শুধু অভিযান নয়, অস্ত্রের উৎস, অস্ত্রপাচার ও অর্থায়নের উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চালানো জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে অপরাধ প্রবণতা কমার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন; দেশে একটি নতুন চক্রের উদ্ভব হয়েছে, যারা অপরাধকেই তাদের আয়-রোজগারের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও সতর্ক হওয়া উচিত।