Ridge Bangla

ভর্তি ও চাকরির পরীক্ষায় নৈতিক সংকট: নতুন চ্যালেঞ্জ এআই

বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষাক্ষেত্র, ব্যাংকিং, ব্যবসা, যোগাযোগ, এমনকি সরকারি ও বেসরকারি চাকরির পরীক্ষা- প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ ও কার্যকর করে তুলেছে। তবে একই সঙ্গে এটি একধরনের নৈতিক সংকটের জন্মও দিয়েছে, বিশেষ করে ভর্তি ও চাকরির পরীক্ষায়।

গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষায় সফলতার জন্য প্রযুক্তিকে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মোবাইল ফোন, স্মার্ট ডিভাইস, ওয়্যারলেস হেডসেট, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পরীক্ষার তথ্য চুরি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনলাইনে উত্তর অনুসন্ধান বা বন্ধুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটছে। এর ফলে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের সীমিত নৈতিক সচেতনতা মিলিত হয়ে একটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা মনে করে, “সবাই করছে, আমি কেন পিছিয়ে থাকব?” এই মানসিকতা তাদের প্রতারণার পথে ঠেলে দেয়। পরীক্ষার সময় মোবাইল বা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে দ্রুত উত্তর পাওয়া গেলেও এতে তাদের প্রকৃত জ্ঞান যাচাই হয় না। এটি শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্যই ক্ষতিকর নয়, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অনলাইন ও কম্পিউটারাইজড পরীক্ষার বিস্তৃত ব্যবহারে নতুন ধরনের নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অনলাইনে পরীক্ষার ক্ষেত্রে হ্যাকিং, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিস্টেম ম্যানিপুলেশনের মতো ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থী বা প্রার্থী পেশাদার হ্যাকারদের সহায়তায় এসব অসদুপায় অবলম্বন করছে। এতে শুধু নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীর নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

সামাজিক ও পারিবারিক চাপও এই সংকটের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক পরিবার সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ও চাকরি পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেয়। এই চাপের মুখে অনেকে প্রতারণার পথ বেছে নেয়, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি তাদের জন্য প্রলোভন হিসেবে কাজ করে। ফলে নৈতিকতার বদলে দ্রুত ফলাফলের দিকেই মনোযোগ বাড়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকারী সংস্থার পর্যাপ্ত তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবও সমস্যাটিকে আরও জটিল করেছে। অনলাইন বা কম্পিউটারাইজড পরীক্ষায় অনেক সময় পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় সহজেই প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়। সিসিটিভি, অনলাইন মনিটরিং ও কঠোর প্রটোকল প্রয়োগের মাধ্যমে কিছুটা সমাধান সম্ভব হলেও তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনে আরও একধাপ এগিয়ে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের এআই প্লাটফর্মের সাহায্য নিচ্ছেন। এসবের মাঝে আছে ওপেন এআই এর চ্যাটজিপিটি, ডিপ সিক এআই প্রভৃতি। যে এআই মডেলগুলো তৈরি করা হয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কর্মকাণ্ডকে আরও সহজ, দ্রুতগতির ও অধিকতর কার্যকর করে তুলতে, এ দেশে এসে বাজে হাতে পড়ে সেসবই ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ধরনের ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের উদ্দেশ্যে।

ক্রমবর্ধমান এই অপচর্চার বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মতামত নিতে, বিষয়টিকে তারা কীভাবে দেখছেন বুঝতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করেছি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আদনান আরিফ সালিম বলেন, “ডিজিটালাইজেশনের নামে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আগের মতো পড়াশোনায় মনোযোগ না দিয়ে বিভিন্ন এআই জেনারেটরের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে দেশের তরুণ সমাজ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঝুঁকে যাবে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির পেছনে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রয়েছে এবং মূল পাঠ্যবই থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা তরুণ সমাজকে বিপদগ্রস্ত করছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করছে। পরীক্ষা শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি প্রতারণা করা যায়, তাহলে সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে পড়ে।

সমাধানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে এবং প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পরীক্ষার সময় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মোবাইল নিষিদ্ধকরণ, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনলাইন পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও হ্যাকিং রোধে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহীন আলম বলেন, “বর্তমান সময়ে বিভিন্ন এআই টুলের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে এবং অল্প সময়ে ফল পাওয়ার আশায় ভয়াবহ ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবার, শিক্ষক ও নিয়োগকারী সংস্থা- এই পুরো ব্যবস্থাকে দায়িত্বশীল হতে হবে।”

এআই এর যথাযথ ব্যবহার এবং এই সেক্টরে যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের তরুণ সমাজ বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক নানা ক্ষেত্রে নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম। এজন্য যেমন ব্যক্তিপর্যায় থেকে উদ্যোগের প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের নানা উদ্যোগ ও আয়োজন। অন্যদিকে, এই এআই এর নেতিবাচক ব্যবহার আমাদের কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তার কেবল শুরুর দিকটাই দেখা আরম্ভ করেছি আমরা। এখনই যদি সংশ্লিষ্ট মহলগুলো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে উঠতে যাচ্ছে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্য।

This post was viewed: 16

আরো পড়ুন