বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্প মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে একটি। ভূ-পৃষ্ঠের নিচে প্লেট সঞ্চালনের ফলে সৃষ্ট এই কম্পন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ধ্বংস করে দিতে পারে শহর, গ্রাম, মানুষের জীবন ও শতাব্দীর গড়ে ওঠা অবকাঠামো। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, কোটি মানুষের গৃহহীনতা এবং অসংখ্য নগর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পেছনে ভূমিকম্পই ছিল প্রধান কারণ। মানবসভ্যতার এই ভয়াবহ দুর্ভাগ্যের সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘটিত বড় বড় ভূমিকম্প।
১) উত্তর আমেরিকা
১৭০০ সালের জানুয়ারিতে উত্তর আমেরিকার উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যদিও এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখন আর নেই, তবে গবেষকেরা একে উত্তর আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প বলে মনে করেন। এর পরবর্তী সুনামিতে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের পাচেনা উপকূলের বহু মানুষ ভেসে যায়।
২) পর্তুগাল – নভেম্বর ১৭৫৫
১৭৫৫ সালের ১ নভেম্বর ইউরোপ কেঁপে ওঠে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে ৮.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই লিসবনের অর্ধেক বাসিন্দা মৃত্যুবরণ করে এবং শহরের বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
৩) ইকুয়েডর – জানুয়ারি ১৯০৬
১৯০৬ সালে ইকুয়েডর ও কলম্বিয়ার সমুদ্র উপকূল ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রচণ্ডভাবে নড়ে ওঠে। বিশাল সুনামির ফলে ৫০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
৪) জাপান – সেপ্টেম্বর ১৯২৩
১৯২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাপানে আঘাত হানে ৭.৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প। টোকিও ও ইয়োকোহামা শহরে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ৪০ ফুট উঁচু সুনামি, পরবর্তী টর্নেডো এবং অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় ১ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ। ইয়োকোহামার ৯০ শতাংশ ভবন ধসে পড়ে এবং টোকিওর বিশাল অংশ বিধ্বস্ত হয়।
৫) চিলি – মে ১৯৬০
বিশ্বের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি ঘটে ১৯৬০ সালের মে মাসে চিলিতে। মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৯.৫। এই ভূমিকম্পের পর ৩০ ফুট উঁচু সুনামি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ধাবিত হয়ে প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটায়। দক্ষিণ আমেরিকার আরেকুইপা শহরেও ১৮৬৮ সালের ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মারা যায়।
৬) রাশিয়া – নভেম্বর ১৯৫২
১৯৫২ সালের নভেম্বরে রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তিন হাজার মাইলজুড়ে অনুভূত হয়। যদিও সুনির্দিষ্ট নিহতের সংখ্যা জানা যায়নি, তবে সুনামির ধাক্কায় বহু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৭) যুক্তরাষ্ট্র – মার্চ ১৯৬৪
১৯৬৪ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ৯.২ মাত্রার ভূমিকম্প ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বিশাল ভূমিধস ও সুনামিতে ১২৮ জন নিহত হয় এবং ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় ৩১ কোটি মার্কিন ডলার।
৮) আফগানিস্তান – মে ১৯৯৮
১৯৯৮ সালে আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ অঞ্চলে পরপর দুটি বড় ভূমিকম্পে কয়েক মাসের ব্যবধানে অন্তত ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। তাখার প্রদেশের ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্পে ২,৩০০ থেকে ৪,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। পরে মে মাসে ৬.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহত হয় আরও প্রায় ৪,৭০০ মানুষ।
৯) ইন্দোনেশিয়া – ডিসেম্বর ২০০৪
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম হলো ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা উপকূলে সৃষ্ট ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্প। শক্তিশালী সুনামি ভারত মহাসাগরজুড়ে তাণ্ডব চালায়, ১৪টি দেশে প্রাণ হারান ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। শুধুমাত্র ইন্দোনেশিয়াতেই ধ্বংস হয়ে যায় দেশটির ৬০ শতাংশ শিল্প ও অবকাঠামো।
১০) কাশ্মীর – মে ২০০৫
২০০৫ সালে কাশ্মীর উপত্যকা ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়। ৭৫ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষের গৃহহীনতা মানবিক বিপর্যয়কে চরমে পৌঁছে দেয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানোও হয়ে ওঠে কঠিন।
১১) চীন – মে ২০০৮
২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ৭.৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় প্রায় ৮৮ হাজার মানুষ। ধারাবাহিক ভবনধস, বিদ্যালয় ধসে পড়ে শিশুদের মৃত্যু এবং প্রায় এক কোটি মানুষের গৃহহীনতা- সব মিলিয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়। এর আগে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ভূমিকম্পগুলোর একটি ছিল ১৫৫৬ সালের শানশি ভূমিকম্প, যাতে মারা যায় প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।
১২) হাইতি – জানুয়ারি ২০১০
২০১০ সালের জানুয়ারিতে হাইতিতে সংঘটিত ৭ মাত্রার ভূমিকম্প পুরো দেশটিকে ধ্বংস করে দেয়। প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার মানুষ মারা যায়, ধসে পড়ে ৮০ হাজার ঘরবাড়ি। ইতিহাসে এটি অন্যতম সর্বাধিক প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত।
১৩) জাপান – মার্চ ২০১১
২০১১ সালের মার্চে জাপানে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ও পরবর্তী সুনামিতে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ মারা যায়। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের প্রভাবে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিশাল বিপর্যয় নেমে আসে, যা চেরনোবিলের পর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর পারমাণবিক দুর্ঘটনা।
১৪) পাকিস্তান – সেপ্টেম্বর ২০১৩
২০১৩ সালে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে পরপর দুটি ভূমিকম্পে ৮২৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। বহু গ্রাম ধ্বংস হয় এবং হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়।
১৫) নেপাল – এপ্রিল ২০১৫
২০১৫ সালে নেপালে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণহানি ঘটে প্রায় ৯ হাজার মানুষের। ধ্বংস হয় ৮০ শতাংশ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা।
১৬) হাইতি – আগস্ট ২০২১
২০২১ সালের আগস্টে হাইতি আবারও ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়। শত শত মানুষের প্রাণহানি, স্কুল–হাসপাতাল ধসে পড়া এবং অবকাঠামো বিনাশে দেশটি আবার মানবিক সংকটে পড়ে।
১৭) আফগানিস্তান – জুন ২০২২
২০২২ সালে আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় অন্তত ১ হাজার মানুষ। ধসে পড়ে সাড়ে চার হাজার বাড়ি।
১৮) তুরস্ক ও সিরিয়া – ২০২৩
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক–সিরিয়ায় সংঘটিত ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প দুই দেশে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গাজিয়ানতেপসহ ১০টি বড় শহর। ভূকম্পন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে লেবানন, সাইপ্রাস থেকে শুরু করে দূরবর্তী গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়।
মানবসভ্যতা ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারে না, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি, সচেতনতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারই একমাত্র পথ। ইতিহাসের ভয়াবহ এসব ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটাই না অসহায়।