Ridge Bangla

বাঘা মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও রহস্যে ঘেরা ৫০০ বছরের অনন্য ঐতিহ্য

রাজশাহীর সবুজ-শ্যামল জনপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাঘা মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি বাংলার সুলতানি আমলের ইতিহাস, শিল্পবোধ ও জনকল্যাণমূলক দর্শনের এক অনন্য স্মারক। পাঁচ শতাধিক বছর ধরে সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকা এই মসজিদ আজও তার সৌন্দর্য, কারুকাজ ও রহস্য দিয়ে ইতিহাসপ্রেমী, পর্যটক ও গবেষকদের আকর্ষণ করে চলেছে। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি প্রথম দেখাতেই জানান দেয় তার গৌরবময় অতীতের কথা। চারপাশের নিরিবিলি পরিবেশ, প্রাচীন দিঘি ও খোলা প্রান্তর মিলিয়ে বাঘা মসজিদ যেন কালের দীর্ঘ পথচলায় আজও অটুট থাকা এক নিঃশব্দ ইতিহাস।

বাঘা মসজিদ নির্মিত হয় ১৫২৩ খ্রিস্টাব্দে। তখন বাংলায় শাসন করছিল হুসেন শাহী বংশ। এই বংশের অন্যতম শক্তিশালী শাসক সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ জনকল্যাণমূলক স্থাপনা নির্মাণে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার শাসনামলে মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে সমাজ ও ধর্মীয় জীবনে স্থায়ী অবদান রাখার চেষ্টা করা হয়। বাঘা মসজিদ তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ইতিহাসবিদদের মতে, এই মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে নয়, বরং তৎকালীন সমাজে শিক্ষা, বিচার ও সামাজিক সমাবেশের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। সুলতানি আমলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রতিচ্ছবি বহন করে এই স্থাপনা।

বাঘা মসজিদের স্থাপত্য একদিকে যেমন মজবুত, অন্যদিকে তেমনি নান্দনিক। প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত মসজিদ প্রাঙ্গণ মাটির সমতল থেকে ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচুতে নির্মিত, যা সে সময়ের স্থাপত্যে উচ্চতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। মসজিদের ভেতরে রয়েছে ছয়টি শক্তিশালী পিলার, যেগুলোর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে মোট ১০টি অর্ধগোলাকার গম্বুজ। এই গম্বুজগুলো মসজিদের ছাদকে যেমন ভারসাম্য দিয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরের শীতল পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

মসজিদে চারটি দৃষ্টিনন্দন মিহরাব ও পাঁচটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রতিটি মিহরাব ও দরজায় খোদাই করা টেরাকোটা অলংকরণ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। দেয়ালের গাঁথুনি নির্মিত হয়েছে চুন-সুরকির মিশ্রণে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থাপনাটিকে টিকিয়ে রেখেছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো দেয়ালজুড়ে থাকা অসংখ্য টেরাকোটা নকশা। শাপলা ফুল, আমগাছ, লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা ও ফার্সি শিল্পের সূক্ষ্ম প্রভাব এই কারুকাজে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রতিটি ইট যেন ইতিহাসের এক একটি পৃষ্ঠা।

মসজিদের ঠিক পাশেই অবস্থিত বিশাল শাহী দিঘি বাঘা মসজিদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। প্রায় ৫২ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই দিঘিটি সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ জনসাধারণের পানির চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে খনন করিয়েছিলেন। চারপাশে সারি সারি নারিকেল গাছ, পাড়জুড়ে খোলা বাতাস আর শীতকালে অতিথি পাখির কোলাহল- সব মিলিয়ে শাহী দিঘি এক অনুপম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্ম দেয়। পূর্ণিমার রাতে দিঘির পানিতে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে যে দৃশ্য তৈরি করে, তা যেন রূপকথার কোনো রাজ্যের ছবি।

বাঘা মসজিদের উত্তর পাশে রয়েছে হজরত শাহ দৌলা (রহ.) ও তাঁর পাঁচ সঙ্গীর মাজার। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই সুফি সাধকেরা এলাকায় ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মাজারকে কেন্দ্র করে আজও ধর্মপ্রাণ মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। ১৯৯৭ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় মাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার হয়। প্রায় ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি পুকুর সদৃশ কাঠামোর সন্ধান মেলে, যা একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি সম্ভবত রাজপরিবারের নারীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি গোপন জলাধার ছিল। এই আবিষ্কার বাঘা মসজিদকে ঘিরে রহস্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

বাঘা মসজিদের ইতিহাস শুধু স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- বাঘার মেলা। প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে টানা তিন দিন ধরে মসজিদ প্রাঙ্গণে বসে এই মেলা, যার বয়সও প্রায় পাঁচ শতাব্দী। এই মেলায় গ্রামীণ হস্তশিল্প, লোকসংগীত, পালাগান, নাগরদোলা ও নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন দেখা যায়। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় অংশ নিতে আসে। বাঘার মেলা আজ শুধু একটি উৎসব নয়, বরং অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাঘা মসজিদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুবার সংস্কার করা হলেও তার মৌলিক রূপ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। এটি আজ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনা এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। একদিকে ধর্মীয় অনুভূতি, অন্যদিকে স্থাপত্যের সৌন্দর্য, আবার কোথাও রহস্য ও লোকজ ঐতিহ্যের সমন্বয়- সব মিলিয়ে বাঘা মসজিদ বাংলার ইতিহাসের এক চিরজাগরুক দলিল। এটি শুধু অতীতের কথা বলে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার বার্তাও দেয়। পাঁচ শতক পেরিয়েও বাঘা মসজিদ আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে- নীরবে, দৃঢ়ভাবে, ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে।

This post was viewed: 40

আরো পড়ুন