Ridge Bangla

বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহ যত ভূমিকম্প

দীর্ঘ কয়েক দশক পরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। সাম্প্রতিক এই কম্পন নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এই ভূখণ্ডে গত কয়েক শতাব্দীতে সংঘটিত বহু বড় ভূমিকম্প পরিবর্তন করেছে ভূপ্রকৃতি, জনজীবন ও নগরায়নের ধারা।

বাংলাদেশে প্রথম বড় ধরনের ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে ১৫৪৮ সালে। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বহু স্থানে তখন মাটি ফেটে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। ফাটল থেকে দুর্গন্ধযুক্ত কাদা–পানি বেরিয়ে আসে। যদিও হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে সেই ভূমিকম্প ছিল ভয়াবহ ভূ-প্রকৃতিগত বিপর্যয়ের নমুনা।

পরবর্তী সময়ে ১৬৪২ সালে সিলেটে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে বহু দালান-কোঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেবারও প্রাণহানির কোনো বর্ণনা নেই।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর একটি ১৭৬২ সালের এপ্রিলে সংঘটিত হয়। ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার চিটাগাং’-এ এর ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে মাটি ফেটে প্রচুর কাদা-পানি ছিটকে বেরোয়। ‘পর্দাবন’ নামক জায়গার একটি বড় নদী শুকিয়ে যায়। ‘বাকর চনক’ নামে পরিচিত এলাকায় প্রায় ২০০ মানুষ ও তাদের গৃহপালিত প্রাণী সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়। ভূমিকম্পের পর বহু স্থানে অতল গহ্বরের সৃষ্টি হয়, মাটির নিচে দেবে গিয়ে গ্রামগুলো পানিতে ভেসে যায়। কথিত আছে, সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে এ ভূমিকম্পের পর দুটি আগ্নেয়গিরির উদ্ভব হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, বর্তমান চট্টগ্রামের বাহারছড়া এলাকা সেই সময়ের ‘বাকর চনক’-ই হতে পারে।

ঢাকাতেও এ ভূমিকম্পের তীব্র প্রভাব পড়েছিল। ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার ঢাকা’ এবং জেমস টেইলরের বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহ দৃশ্য- নদী ও ঝিলের পানিতে প্রবল আলোড়ন, পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠা, এবং ভূকম্পন থামার পর পানির নিচ থেকে উঠে আসা অসংখ্য মৃত মাছ। ঢাকার বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং প্রায় ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ভূগর্ভস্থ গম্ভীর শব্দে পুরো শহর আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।

১৭৭৫ ও ১৮১২ সালের ভূমিকম্পও ঢাকা ও সিলেট অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি করে।

১৮১২ সালের ভূমিকম্পে সিলেটে বেশ কিছু স্থাপনা ধসে পড়ে। যদিও বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি। এরপর ১৮৬৫ সালের শীতকালে সীতাকুণ্ডের এক পাহাড় ফেটে বালি ও কাদা বের হয়ে আসে আরেক ভূমিকম্পে। এটি তেমন বড় ক্ষতি না করলেও ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৮৮৫ সালে ঘটে ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’, যার মাত্রা ছিল প্রায় ৭। উপকেন্দ্র ছিল মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার কোদালিয়া। এই কম্পন ঢাকার বাইরে ভারতের বিহার, সিকিম, মণিপুর এবং মিয়ানমার পর্যন্ত অনুভূত হয়। ঢাকা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার বহু দালান-কোঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও প্রাণহানির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি, তবু ভূমিকম্পটি ছিল অত্যন্ত তীব্র।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক বড় ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পটি ঘটে ১৮৯৭ সালের ১২ জুন মাসে, যা পরিচিত ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে। এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল প্রায় ৮। ‘বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার পাবনা’-র তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জে উপবিভাগীয় অফিস, কারাগার, ডাকঘরসহ অসংখ্য স্থাপনা ভেঙে পড়ে। অ্যান্ড্রু ইউল অ্যান্ড কোং-এর পাটের ব্যাগের ফ্যাক্টরি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়। পাবনার কোর্ট হাউসসহ অন্যান্য ইটের স্থাপনা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটি ফেটে চির সৃষ্টি হয়, বহু কূয়া ভরে যায় ভূগর্ভস্থ বালি ও পলিমাটিতে।

চট্টগ্রাম এবং ঢাকাতেও ভয়াবহ কম্পনের চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে পড়ে, রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঢাকায় সরকারি ভবনের মেরামত বাবদ ব্যয় হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ রূপি। এই ভূমিকম্পে কেবল সিলেটেই প্রাণহানি ঘটে ৫৪৫ জনের। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের ক্ষতি হয়, তখনকার হিসাবে যা ছি;ল প্রায় ৫০ লাখ টাকার।

এরপর ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৬। এটি মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অনুভূত হয়। শ্রীমঙ্গলের বহু স্থাপনা ধসে পড়ে, বাড়িঘর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে আসাম ভূমিকম্প, মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৭। এটি বিংশ শতকের অন্যতম বড় ভূমিকম্প হলেও বাংলাদেশে তেমন ক্ষতি হয়নি।

১৯৯৭ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে বহু ভবনে ফাটল ধরে। ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে মহেশখালী দ্বীপে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে বহু বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দুটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর, যার কারণে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইতিহাসও জানায়, বড় ভূমিকম্প আসলে তা শুধু স্থাপনা নয়, বদলে দিতে পারে ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনের ধারা। তাই বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, টেকসই নির্মাণকৌশল অবলম্বন এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

এই পোস্টটি পাঠ হয়েছে: ২৬

আরো পড়ুন