Ridge Bangla

বরিশালে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে এইচআইভি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি (অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই তরুণ শিক্ষার্থী, যা স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের সকলেই সমকামীতার সঙ্গে যুক্ত।

এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন সম্প্রতি এই উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরীক্ষা করানো মোট ৩ হাজার ১৩০ জনের মধ্যে ২০ জন নতুন করে এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জনই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ১৭ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। তারা এইচএসসি থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রী। আক্রান্তদের অনেকে বরিশালের বাইরের জেলা থেকে এসে এখানে অবস্থান করছেন।

শিক্ষার্থী ছাড়াও নতুন করে শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে তিনজন প্রবাসী এবং বিভিন্ন পেশার স্থানীয় ছয়জন রয়েছেন। স্থানীয়দের মধ্যে একজন হিজড়াও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে, আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা সবাই সমকামীতার সাথে জড়িত। তাদের সকলকে বর্তমানে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তাদের মাধ্যমে যেন ভাইরাসটির আরও বিস্তার না ঘটে সেজন্য সকলকে নিবিড় ফলোআপ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সেলিং প্রদান করা হচ্ছে।

আক্রান্তরা সাধারণত অস্বাভাবিকভাবে ওজন হ্রাস, রক্তাল্পতা, দীর্ঘস্থায়ী মাথা ব্যথা এবং পাতলা পায়খানা বন্ধ না হওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এরপরই পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়েছে। তবে কেউই স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরীক্ষা করাতে আসেনি।

জসিম উদ্দিন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আক্রান্ত ব্যক্তিরা যাদের সঙ্গে অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, তাদের অনেকেই এখনও পরীক্ষা করাননি। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বরিশালের এই স্থানীয় চিত্র জাতীয় এইডস পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রামের (এনএএসপি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে এইচআইভি সংক্রমণের হার কম (০.০১ শতাংশের নিচে) থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা তুলনামূলকভাবে বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক বৃদ্ধি। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীরা সংখ্যায় বেশি হলেও ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যেও সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

নতুন রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের একটি বড় অংশই সমকামী এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করেন এমন ব্যক্তিরা। এছাড়াও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার বেড়েছে।

এনএএসপির তথ্যমতে, দেশে এইচআইভি আক্রান্ত আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জনের মধ্যে প্রায় ৮১.৮৮ শতাংশকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং শনাক্তদের ৭৪ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৪টি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুশিউল মুনীর এই পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

This post was viewed: 48

আরো পড়ুন