Ridge Bangla

পাকিস্তানের অর্থনীতির এমন ভঙ্গুর দশা কেন?

পাকিস্তান একটা লম্বা সময় ধরেই অর্থনৈতিক সংকটের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে এই সংকট এতটাই ঘনীভূত হয়েছে যে, খোদ দেশটির অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকাই প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে। দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে নেমেছে, মুদ্রাস্ফীতি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে, এবং জীবনধারণের খরচ আকাশছোঁয়া।

পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে প্রায়শই রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বের আশঙ্কা করা হয়। বিগত কয়েক দশক ধরে প্রায় ২৫ বারের বেশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ নিয়েও পাকিস্তানের অর্থনীতি কেন এই ভঙ্গুর দশায়, তা বোঝার জন্য এর বেশ কিছু দিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই অর্থনৈতিক দুর্দশার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাব এবং মৌলিক অর্থনৈতিক কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা।

​​পাকিস্তানের অর্থনীতির মূল কাঠামোগত সমস্যা হলো এর রাজস্ব কাঠামো। সরকার ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কর সংগ্রহ করতে পারে না, যা এক বিশাল ‘রাজস্ব ঘাটতি’ তৈরি করে। পাকিস্তানের জিডিপিতে করের অনুপাত (Tax-to-GDP Ratio) অত্যন্ত কম, যা প্রায় ১০ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। এই অনুপাত অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ, এমনকি আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক নিচে।

এর পাশাপাশি জনগণের একটি বৃহৎ অংশ, বিশেষত ধনী কৃষক, রিয়েল এস্টেট এবং অন্যান্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায় বা ব্যাপক কর ছাড় উপভোগ করে। আইএমএফ-এর মতে, এই গোষ্ঠী প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৪.৬ শতাংশের বেশি অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে শুষে নেয়।

যেহেতু পাকিস্তানের সরকার পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় করতে পারে না, তাই সরকারকে নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নিতে হয়। এই ঋণের সুদ পরিশোধেই বাজেটের সিংহভাগ অর্থ চলে যায়, যার ফলে উন্নয়নমূলক কাজ এবং সামাজিক খাতে বিনিয়োগের জন্য কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। এটি পাকিস্তানকে একটি স্থায়ী ঋণের ফাঁদে আবদ্ধ করেছে।

পাকিস্তানের রপ্তানি খাত অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং লম্বা সময় পার হওয়ার পরও এতে বৈচিত্র্য আসেনি। দেশটির রপ্তানি আয়ের প্রধান অংশই আসে ‘বস্ত্র’ খাত থেকে। অন্যদিকে, তেল, খাদ্যপণ্য এবং যন্ত্রপাতি আমদানির উপর দেশটির নির্ভরতা অত্যধিক। রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় প্রতি বছরই একটি বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বা বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলে এই ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।

​বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে বা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। এতে মুদ্রার মান দ্রুত হ্রাস পায়। এটি আমদানি আরও ব্যয়বহুল করে তোলে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করে।

​রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সুশাসনের অভাব

​পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের গভীরে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থা।

পাকিস্তানের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সেনাবাহিনীর একটি বড় এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয়, যা জিডিপি-র একটি বড় অংশ দখল করে, তা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের মতো মানব উন্নয়নমূলক খাতগুলোর ব্যয়কে সংকুচিত করে। উপরন্তু, সামরিক সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব সৃষ্টি করে। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং বেসামরিক-সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠিন অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি কার্যকর করতে পারে না। প্রতিটি নতুন সরকারই পূর্ববর্তী সরকারের নীতি বাতিল করে স্বল্পমেয়াদী জনপ্রিয়তাবাদী সিদ্ধান্ত নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ক্ষতি করে।

​আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে দুর্নীতি ‘স্থায়ী এবং ক্ষয়কারী’। এটি বাজারের বিকৃতি ঘটায় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। রাষ্ট্রের মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলো প্রায়শই উচ্চ লোকসান নিয়ে চলে, যা সরকারের উপর অতিরিক্ত ভর্তুকি ও ঋণের বোঝা চাপায়।

​অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি, পাকিস্তান দুটি বাহ্যিক চাপের মুখে রয়েছে। একটি হচ্ছে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি। পাকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি, যা সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং মাথাপিছু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে।

আরেকটি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো দেশটির কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে, যা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

​পাকিস্তানের অর্থনীতির এই ভঙ্গুর দশার মূল কারণ হলো- তারা দীর্ঘকাল ধরে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মোকাবিলা না করে বারবার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে। আইএমএফ, সৌদি আরব বা চীনের সহায়তা কেবল সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু মৌলিক সমস্যার সমাধান করে না। পাকিস্তানের অর্থনীতির টেকসই উন্নতির জন্য প্রয়োজন কর কাঠামোতে আমূল সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা। যতক্ষণ পর্যন্ত না সুশাসন নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশটির অর্থনীতি ঋণের চক্র থেকে মুক্তি পাবে না।

This post was viewed: 36

আরো পড়ুন