ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর তিন দিন বাকি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গতকাল রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছেন বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপিসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট সাত দিন নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, মাঠে রয়েছেন মোট ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ জন, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বিএনসিসির ১ হাজার ৯২২ ক্যাডেট এবং ৪৫ হাজার ৮২০ গ্রাম পুলিশও মাঠে রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও নির্বাচনি এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালনের সব ক্ষেত্রেই বাহিনীগুলো সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করবে। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রভেদে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনে ভিন্নতা রাখা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ থেকে ১৮ জন সদস্য দায়িত্বে থাকবেন। মেট্রোপলিটন এলাকায় সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে। দুর্গম ২৫টি জেলার কেন্দ্রে ১৬ থেকে ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সেনাবাহিনী আগেই মাঠে ছিল, রোববার থেকে তাদের তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। ইসির কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিজস্ব সিকিউরিটি অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যালট বাক্স ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তারা তা গ্রহণ করছেন। নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কমিশনের মতে, ভোটের পরিবেশ অনুকূলে রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রায় ৫০০ বিদেশি প্রতিনিধি ও সাংবাদিক বাংলাদেশে আসছেন। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে তাঁদের জন্য বিশেষ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনাররা উপস্থিত থাকবেন এবং নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি তুলে ধরবেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়েই শেরপুর-৩ আসন ছাড়া ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন স্থগিতের গুজবে কান না দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
পোস্টাল ভোটে অংশগ্রহণকারী ভোটারদের জন্যও জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে কিউআর কোড স্ক্যান করে ব্যালট সংবলিত খাম পোস্ট অফিসে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যালট বাতিল বলে গণ্য হবে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের পাঠানো ৩ লাখ ১৮ হাজার ১২৫টি পোস্টাল ব্যালট ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দপ্তরে পৌঁছেছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে ডাকযোগে ভোট দেওয়া ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৭টি ব্যালটও কর্মকর্তাদের কাছে জমা পড়েছে।
এদিকে দুর্গম এলাকাগুলোতে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটির ২০টি দুর্গম ভোটকেন্দ্রে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নির্বাচনি সরঞ্জাম ও জনবল পাঠানো শুরু হয়েছে। বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির এসব কেন্দ্রকে ‘হেলিসর্টি ভোটকেন্দ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার ২৯৯টি আসনে মোট ২ হাজার ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আড়াই শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। দেশের ১৩ কোটি ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র। ইসি জানিয়েছে, ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে সব ধরনের নির্বাচনি প্রচার শেষ করতে হবে। এরপর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।