ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান চিত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিরোধ, প্রভাব বিস্তার ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে হওয়া ধারাবাহিক সহিংসতায় সম্ভাব্য প্রার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতির অবনতির কারণে অনেক নেতা ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ১২ ডিসেম্বর হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর অপারেশন ডেভিল হান্টের ফেজ-২ শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে, ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৪ দিনের অভিযানে দেশজুড়ে ১৫ হাজারের অধিক আটক ও দুই শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অভিযান চলমান থাকলেও সহিংসতা কমেনি।
অভিযানের মধ্যেই ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে। এর আগে-পরে ঢাকাসহ খুলনা, যশোর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি বা আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব হত্যার কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, নরসিংদী, যশোর ও পটুয়াখালীতে অন্তত আটজন হত্যার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুসহ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও, যা দেশজুড়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক জানান, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের কারণে ভোটার ও প্রার্থীরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। আমাদেরকে ঝুঁকি নিয়েই প্রচারণায় নামতে হচ্ছে। তার মতে, যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও বিপদজনক হয়ে উঠবে।
এসবের পাশাপাশি ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই হাজারের বেশি বন্দির অনেকেই এখনো অধরা। এমনকি পুলিশি স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্র ও পলাতক অপরাধীরা আসন্ন নির্বাচনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে তিন হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে এ সময় রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেছেন, সাম্প্রতিক অনেক হত্যাকাণ্ড অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে ঘটেছে। আবার এখন যারা হামলার শিকার হচ্ছেন, তারাই সবাই যে অপরাধের সাথে যুক্ত, এমনটিও বলা যাবে না। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।