১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ নতুন এক ভোরের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই স্বাধীনতা এসেছিল এক নিদারুণ মূল্যের বিনিময়ে। ভারতবর্ষকে ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত করা হয়, যার ফলে জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের। এই বিভাজনই ইতিহাসে ‘দেশভাগ’ নামে পরিচিত। এটি কেবল মানচিত্রের সীমারেখা পরিবর্তন করেনি, বরং হাজার হাজার বছরের পুরনো এক সভ্যতাকে চিরতরে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসের এই রক্তক্ষয়ী আখ্যান লাখ লাখ মানুষের জীবনে এনেছিল চরম ট্র্যাজেডি, যা আজও উপমহাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক মননে গভীর ছাপ ফেলছে।
দেশভাগের পটভূমি নিহিত ছিল মূলত মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উত্থাপিত ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ বা ‘Two Nation Theory’ এর মধ্যে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী দাবি করা হয় যে হিন্দু ও মুসলিম দুটি ভিন্ন জাতি, যাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনধারা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই তারা একই রাষ্ট্রে বসবাস করতে পারে না। যদিও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছিল, ব্রিটিশদের ‘Divide and Rule’ (ভাগ করো ও শাসন করো) নীতি এবং ১৯৪০-এর দশকে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার রেষারেষি শেষ পর্যন্ত বিভাজনকে অনিবার্য করে তোলে।
ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাড়াহুড়ো করে ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ এগিয়ে আনেন। স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘সীমানা নির্ধারণ কমিশন’। এই কমিশন মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলকে দুটি অংশে বিভক্ত করার অসাধ্য সাধন করে ফলে। এই র্যাডক্লিফ লাইন, যা কেবল মানচিত্রে আঁকা হয়েছিল, তা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বা ভূখণ্ডের স্বাভাবিকতাকে গুরুত্ব দেয়নি। ফলে পাঞ্জাব ও বাংলা- এই দুটি প্রদেশে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা।
দেশভাগের সবচেয়ে ভয়াবহ ফল ছিল এর মানবিক ট্র্যাজেডি। রাতারাতি লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভারত থেকে পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়। এটি ছিল মানব ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে দ্রুততম অভিবাসনগুলোর মধ্যে একটি।
অনির্দিষ্ট সীমানা এবং অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে পাঞ্জাব ও বাংলায় শুরু হয় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা চরম আকার ধারণ করে। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই অপর পক্ষের হাতে নৃশংসতার শিকার হয়। এই দাঙ্গায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয় বলে অনুমান করা হয়। ট্রেন ভর্তি মৃতদেহ, শরণার্থী শিবিরে চরম দুর্দশা, এবং পরিবারের সদস্যদের চিরতরে হারানোর বেদনা এই সময়ের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। দেশভাগ কেবল মানুষকে তার বাড়ি থেকে সরায়নি, এটি তাদের পরিচয়, স্মৃতি এবং হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিকড় উপড়ে ফেলে দিয়েছিল।
দেশভাগের ক্ষত কেবল ১৯৪৭ সালে শেষ হয়নি; এর জের আজও পুরো উপমহাদেশ বহন করছে। দেশভাগের অব্যবহিত পরেই কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্ম হয়, তা এখনও দুই দেশের সম্পর্কের মূল সমস্যা। ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত কাশ্মীর দুই দেশের মধ্যে শত্রুতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।
এর পাশাপাশি দেশভাগের ফলে জন্ম নেওয়া পূর্ব পাকিস্তান ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়, জন্ম নেয় আমাদের বাংলাদেশ। এটি প্রমাণ করে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি।
দেশভাগের শিকার হওয়া মানুষগুলোর পরবর্তী প্রজন্ম আজও শরণার্থীর পরিচয় নিয়ে বেঁচে আছে। বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী এলাকায় আজও সেই যন্ত্রণার ইতিহাস ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান। দেশভাগের পর উভয় দেশেই সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রান্তিকতার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িকতা বারবার উসকে দেয়া হয়েছে, যা দেশভাগের প্রধান নির্মমতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
দেশভাগ ছিল এক চরম রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যার দায় বহন করতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। স্বাধীনতা এসেছে ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে উপমহাদেশের মাটি ভিজেছে লাখ লাখ মানুষের রক্তে। কবিদের কবিতায়, সাহিত্যিকদের আখ্যানে এবং সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে এই বিভাজনের করুণ গাথা আজও জীবন্ত।
দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি হলো এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির দলিল, যা উপমহাদেশকে আজও দেখিয়ে দেয় উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং অদূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই ক্ষতবিক্ষত আখ্যানের ভার বহন করেই উপমহাদেশকে তার ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে হবে।