গত বছর জুলাইয়ে কোটা সংস্কার নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন বিভিন্ন ঘটনার পরিক্রমায় সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। যার ফলে ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে চলে যান।
বিক্ষোভ চলাকালীন আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়নে জনগণ ফুঁসে উঠেছিল। যার ফলে ৫ আগস্টে সরকার পতনের দিন হতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের বিভিন্ন থানায় ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এ সময় বিভিন্ন থানায় আক্রমণ করে দুষ্কৃতকারীরা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও হামলার পাশাপাশি অস্ত্রসহ গোলাবারুদ লুটপাট করে। গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লুট হওয়া এসব অস্ত্র উদ্ধারের জন্য একের পর এক অভিযান পরিচালনা করা হলেও সে সময় যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল তার উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।
উল্লেখ্য, পুলিশের এই তালিকার বাইরেও এসএসএফের (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের) বেশ কিছু অস্ত্র-গোলাবারুদ ওই সময়ে খোয়া যায়। এখন অব্দি সেগুলোও সব উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর থানাগুলোয় ঠিক কী পরিমাণ অস্ত্র মজুত ছিল তার নথিপত্র হামলায় পুড়ে যাওয়ায় তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কেউ। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নথিপত্রগুলো সঠিকভাবে যাচাই করা গেলে সংখ্যাটা বাড়বে।
পুলিশের হিসাব বলছে, লুট হওয়া মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে গত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৩টি উদ্ধার সম্ভব হলেও বাকি ১ হাজার ৩৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো নিখোঁজ রয়েছে। গোলাবারুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজারের বেশি গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার। বাকিগুলো এখনো নিখোঁজ।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে গত বছরের ৪, ৫ ও ৬ আগস্ট সারা দেশে অন্তত ১২০টি থানায় হামলা হয়। এর মধ্যে ৬২টি থানা ভাঙচুর এবং ৫৮টি থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১১৪টি পুলিশ ফাঁড়ি ও এক হাজারের বেশি যানবাহন।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থানাগুলোর মধ্যে রয়েছে যাত্রাবাড়ী, উত্তরা পূর্ব, ভাটারা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, শ্যামপুরসহ একাধিক থানা। রাজধানীর বাইরে সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, বগুড়া ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার থানায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়।
দুষ্কৃতিকারীদের হামলায় শুধু অস্ত্র লুটপাটই হয়নি, এসময় প্রাণ হারিয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য। ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হওয়া হামলায় ১৩ পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পরে হাসপাতালে আরও একজন মারা যান। নোয়াখালীতে দুই থানায় হামলায় নিহত হন পুলিশের তিন সদস্যসহ মোট আটজন।
ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরুদ্দেশ অস্ত্রগুলো এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী দেশে একের পর এক হওয়া প্রকাশ্য টার্গেট কিলিং ও সহিংসতায় এসব অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত পার হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসা অস্ত্রের ব্যবহারও বাড়ছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিখোঁজ অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করলেও তেমন কোনো সাড়া মেলেনি। এসব অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। গত ৫ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৮১ শতাংশ এবং গোলাবারুদের ৭৩ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের পরিমাণ এখন প্রায় ৭৭ শতাংশ। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, নিখোঁজ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।