বুধবার, বিকেল তিনটা। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ। আকাশ যেন নতজানু, বাতাসে শোকের আবেগ। সময় যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক বিদায়ের মুখোমুখি। দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ভোর থেকেই জড়ো হতে শুরু করেন সর্বস্তরের মানুষ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধাবিত মানুষে পরিণত হয় পুরো এলাকা এক অপার জনসমুদ্রে। এ শুধু একটি জানাজা ছিল না; এটি ছিল প্রেমের এক নিঃশব্দ অথচ মর্মস্পর্শী অভিব্যক্তি, এক জনতার অন্তহীন ভালোবাসার উৎসার।
অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্বর ফেসবুক পেজে শেয়ার করা ছবিগুলো যেন কথা বলে। মানুষের সেই ঢল, চোখে অশ্রু, মুখে নীরব প্রার্থনা, সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, “ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার প্রমাণ এই জনসমুদ্র।” কথাগুলো যেন সেদিনের চিত্রকল্পকে ভাষা দিল। সত্যিই তো, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের অন্তরে ঠাঁই করে নেওয়া- সেটাই তো চিরস্থায়ী আসন।
দুপুর ২টা ৫৮ মিনিটে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটে। তাদের মধ্যেই ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা।
শোক যেন অতিক্রম করেছে সীমানা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল এবং মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত ড. আলী হায়দার আহমেদ ঢাকায় উপস্থিত হয়ে শোক প্রকাশ ও সমবেদনা জানান। দক্ষিণ এশিয়ার এই সম্মিলিত শোকবার্তাই প্রমাণ করে, খালেদা জিয়া কোনো দল বা গোষ্ঠীর নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই জাতি-রাষ্ট্রেরই এক অপরিহার্য প্রাণের স্পন্দন।
জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বামী, দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এরপর তোপধ্বনির মাধ্যমে গান স্যালুট প্রদর্শন করে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। সরকার ও তিন বাহিনীর প্রধানরাও তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সেদিনের সেই জনসমুদ্র শুধু লাশের পেছনে চলা শোকের মিছিল ছিল না; এ ছিল একজন নেত্রীর প্রতি আস্থা, ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধার নীরব কিন্তু বলিষ্ঠ প্রকাশ। খালেদা জিয়া চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও সংগ্রামের স্মৃতি এই জনতার হৃদয়ে চিরজাগরূক থাকবে।