Ridge Bangla

চীনা পাত্রের ফাঁদে বাংলাদেশি তরুণীরা: বাড়ছে প্রতারণা ও নারীপাচার

লোভ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষের জীবনে চিরন্তন দুটি সত্য। একটি সুন্দর জীবনের লোভ এবং সেই জীবন পাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় মানুষ হচ্ছে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, প্রকাশ করছে নিজের দুর্বলতা। আপনার কাছে যা দুর্বলতা, অন্যদের জন্য সেটাই সুযোগ। সেই দুর্বলতারই সুযোগ নিচ্ছে একটি ভয়ানক সংঘবদ্ধ চক্র।

দু’চোখে একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। চোখের কল্পনায় ভাসমান সুন্দর সেই জীবনকে বাস্তবে পরিণত করতে মানুষ ছাড়ছে তার ঘরবাড়ি ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে বর্তমানে আমাদের দেশের তরুণীরা একটি সুন্দর জীবনের আশায় হাত ধরছেন মাত্র মাসখানেক ধরে চেনা বিদেশি তরুণদের।

খুলনার দাকোপের মেয়ে পিংকি সরকারকে ভালোবেসে বাংলাদেশে আসেন চীনের যুবক ঝাং বুথাও। ২৯ জুন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তাদের দুজনের বিয়ে হয়। একইভাবে প্রেমের টানে বাংলাদেশে আসা চীনের নাগরিক শি তিয়ান জিংয়ের সঙ্গে মাদারীপুরের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের বিয়ে হয় ২৭ জুলাই।

খবরের কাগজে চোখ রাখলে এভাবেই একের পর এক চীনা নাগরিকের সাথে বাংলাদেশি তরুণীদের বিয়ের সংবাদ আপনার চোখে পড়বে।

প্রেমের টানে বিদেশী যুবকদের বাংলাদেশে ছুটে আসার ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হচ্ছে। নেটিজেনরাও বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে নানাভাবে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন। এই সম্পর্কগুলোকে ‘সীমানা পেরোনো ভালোবাসার বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। আপাতদৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক বৈসাদৃশ্য সত্ত্বেও এই মিলনের কাহিনীগুলো যেন ভালোবেসে কাছে আসার এক রোমান্টিক বিজয়ের গল্প তুলে ধরে।

কিন্তু এই আলোর ঝলকানি ফুরিয়ে গেলে কী হয়? এক মাস, ছয় মাস বা এক বছর পর এই সম্পর্কগুলো ঠিক কোন অবস্থায় থাকে? সেই খবর কেউ রাখে না। কারণ স্ক্রলিংয়ের এই আধুনিক জগতে এক ঘন্টা পরের নিউজটাও হারিয়ে যায় সীমাহীন তথ্যের গভীরে।

তবে গবেষণামূলক অনুসন্ধান বলছে, এই চকচকে গল্পের আড়ালে প্রায়শই লুকিয়ে থাকে প্রতারণা এবং মানব পাচারের ভয়াবহ ঝুঁকি। অতি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া চীনা যুবকের সাথে বিয়ের পর সে দেশে পাড়ি জমানো এক বাংলাদেশী তরুণীর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মুখের কান্নার ছবি যেন সেই আড়ালের গল্পই তুলে ধরে।

আন্তঃদেশীয় সম্পর্কের আড়ালে যে পাচার চক্র সক্রিয়, তাতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে চীনা নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। দেখা গেছে, চীনের কিছু অসাধু নাগরিক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দরিদ্র মেয়েদের টার্গেট করে পরিচালনা করছে ‘চাইনিজ ম্যারিজ স্ক্যাম’। যে পরিকল্পনার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশি মেয়েরা।

বাংলাদেশে অবস্থিত চীনা দূতাবাস গত ২৫ মে এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে আনুষ্ঠানিক সতর্কতা জারি করেছিল। তবে নিজ দেশের নাগরিকরা এই চক্রের সাথে যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় তারা সরাসরি যে তাদের নাগরিকদের এই ধরনের কাজে যুক্ত থাকতে বারণ করতে পারেনি তা বলাই বাহুল্য।

এই ভয়াবহ অপরাধের মূল শিকড় চীনের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘকাল ধরে কার্যকর থাকা ‘এক সন্তান নীতি’ দেশটিতে নারী-পুরুষের অনুপাতে আশঙ্কাজনকভাবে ব্যবধান সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে সেখানে প্রায় ১১৫ জন পুরুষ রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলগুলোয় এই নারী-সংকট মহামারীর আকার ধারণ করেছে। অনেক পুরুষ নারী-সংকটে বিয়ে করতে পারছে না, যা বংশধারা টিকিয়ে রাখার চিন্তায় তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আর এই সামাজিক সংকটকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র পরিকল্পিতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র তরুণীদের প্রেম ও বিয়ের ফাঁদে ফেলে চীনে পাচার করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চীনা নাগরিকরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও বিভিন্ন অ্যাপে নামে-বেনামে একাউন্ট খুলে গ্রামাঞ্চলের আর্থিকভাবে অসচ্ছল তরুণীদের দেশীয় দালালদের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে, তাদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে সুসম্পর্ক তৈরি করে। ট্রান্সলেটর অ্যাপ ব্যবহার করে কিছুদিন প্রেম, মিষ্টি মিষ্টি কথা ও কিছু উপহার দেয়ার পর হঠাৎই বিয়ের কথা চলে আসে। উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঘোরে থাকা গ্রামাঞ্চলের এসব অসচ্ছল পরিবারের মেয়েরা ভাবে- এত মনোযোগ নিশ্চয়ই ভালোবাসার! অথচ এর পেছনে কাজ করছে এক সুসংগঠিত মানবপাচার নেটওয়ার্ক।

বিয়ের পর এই বাংলাদেশি তরুণীদের চীনে একটি সুন্দর জীবনের লোভ দেখানোর মাধ্যমে শুরু হয় আসল কাজ। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নারীদের চীনে নিয়ে যাওয়া হয়। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো হলেও বিদেশে যাওয়া নারীদের বেশিরভাগকেই বাধ্য করা হয় পতিতাবৃত্তিতে। নয়তো বিক্রি করে দেয়া হয় বয়স্ক পুরুষদের কাছে বা অন্য কোনো চক্রের হাতে। রাজি না হলে চলে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ভাষা না জানায় যোগাযোগ অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, পালানোর চেষ্টা করলেই মারধর। ফলে অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

সম্প্রতি র‍্যাব কর্তৃক আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের সদস্যদের (যাদের মধ্যে চীনা নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত) গ্রেপ্তারের ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চীনা পাত্রদের হাতে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশিয়ার নারীরাই বেশি পাচারের শিকার হন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু পাকিস্তানেই ২০১৮-১৯ সালে ২ বছরে ৬ শতাধিক তরুণীকে বিয়ের নামে চীনে পাচার করা হয়।

২০১৯ সাল থেকে চীনা নাগরিকদের দরুন বাংলাদেশে বাড়তে থাকা এই ধরনের পাচার ও প্রতারণার ঘটনা এখন শুধুমাত্র চীনাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন সহ আরও বেশ কিছু দেশের নাগরিকরাও বাংলাদেশে এসে নানা ধরনের স্ক্যামে জড়িত হচ্ছে। তারা মূলত ‘গিফট স্ক্যাম’, ‘লটারি স্ক্যাম’ বা ‘বিনিয়োগের লোভ’ দেখিয়ে অনলাইন প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে আর্থিক প্রতারণা করে।

দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ থাকা সত্ত্বেও পাচারকারীদের সাজা হওয়ার হার অত্যন্ত কম  (১.৭ শতাংশ)। মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হতে গড়ে ১১ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এই দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। এছাড়াও, অনেক পরিবার লজ্জায় মুখ খোলে না বা মামলা করতে চায় না। পাচারকারী চক্রের সদস্যরা প্রভাবশালী ও অর্থশালী হওয়ায় অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও স্থবির হয়ে পড়ে।

অনেক নারী এবং তাদের পরিবার মনে করে, একজন বিদেশী নাগরিককে বিয়ে করা মানে নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা এবং সমাজে উচ্চ মর্যাদা লাভ করা। এই ‘সাদা চামড়ার মোহ’ এবং ‘অর্থের লোভ’ সম্পর্কের মূল ভিত্তি তৈরি না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। এই অপরাধে শুধু পাচারচক্রের নয়, সমাজ ও পরিবারেরও আছে বিরাট ভূমিকা। আমরা এখনো মনে করি, বিদেশে বিয়ে মানেই ভাগ্য বদল। অনেক দরিদ্র পরিবার তাই মেয়েকে বিদেশে পাঠানোর সুযোগকে আশীর্বাদ ভাবছে। এই অন্ধ বিশ্বাসকেই পুঁজি করে অপরাধীরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্ক যাচাইয়ে সময় নিন। আগত ব্যক্তির ভিসার বৈধতা, চাকরির কাগজপত্র এবং স্থায়ী ঠিকানা স্বাধীনভাবে যাচাই করুন। দ্রুত বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার পাশাপাশি ‘সাদা চামড়া’ বা ‘টাকার নিরাপত্তা’ দেখে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নিতেও বারণ করেছেন তারা।

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করুন, কোনো প্রকার সন্দেহ হলে অবিলম্বে তাদের নিরুৎসাহিত করুন। বিয়ের আগে বাংলাদেশে এসে বিদেশী নাগরিকের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের জন্য বৈধ ভিসা ও পারমিট আছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব পেলে আগে দেশের সংশ্লিষ্ট শ্রম শাখা (লেবার উইং) বা সরকারি এজেন্সির মাধ্যমে সব নথিপত্র পরীক্ষা করিয়ে নিন।

আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা কোনো ভুল নয়, কিন্তু এই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে ভালোবাসা ও স্বচ্ছতা, লোভ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার আবেগ নয়। প্রতিটি প্রেমের টানে ছুটে আসার গল্পকে যেন পাচারের ফাঁদে পরিণত হতে না হয় সেজন্য রোমান্টিক হাইপ নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন দিকগুলো সম্পর্কে আমাদের সকলের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তেমনিভাবে প্রয়োজন যারা এই পাচারচক্রের হাত থেকে ফিরে এসেছেন তাদের পুনর্বাসন করাও। এক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গ্রামাঞ্চলে অন্য মেয়েদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন