Ridge Bangla

একটি বাণিজ্য চুক্তি কীভাবে সম্পন্ন হয়?

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কোনো রাষ্ট্রই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। প্রতিটি দেশকেই তার প্রয়োজনের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে একটি আইনি ও কাঠামোগত রূপ দিতে দেশগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে। যখন দুটি দেশ নিজেদের মধ্যে পণ্য ও সেবার আদান-প্রদান সহজতর করার লক্ষ্যে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তাকে বলা হয় ‘দ্বিদেশীয় বাণিজ্য চুক্তি’। একটি সফল বাণিজ্য চুক্তি কেবল দুই দেশের আমদানি-রপ্তানিই বাড়ায় না, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া কোনো সহজ কাজ নয়; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ কয়েক বছরের প্রস্তুতি, জটিল দরকষাকষি এবং আইনি যাচাই-বাছাই।

​প্রাথমিক ধাপ: সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রস্তুতি

একটি বাণিজ্য চুক্তির যাত্রা শুরু হয় ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ বা Feasibility Study-র মাধ্যমে। কোনো একটি দেশ যখন অন্য একটি দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে চায়, তখন দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একটি যৌথ গবেষণা চালায়। এই গবেষণায় দেখা হয় চুক্তিটি হলে কোন দেশ বেশি লাভবান হবে, কোন পণ্যগুলোর শুল্ক কমালে স্থানীয় শিল্পের ক্ষতি হতে পারে এবং চুক্তির ফলে কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়বে। যদি গবেষণার ফলাফল ইতিবাচক হয়, তবেই দেশ দুটি আনুষ্ঠানিক আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয়।

​দ্বিতীয় ধাপ: সমঝোতা স্মারক ও আলোচ্যসূচি নির্ধারণ

আলোচনার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে। এরপর তৈরি করা হয় ‘টার্মস অফ রেফারেন্স’ (ToR) বা আলোচনার মূল রূপরেখা। এই পর্যায়ে ঠিক করা হয় চুক্তির পরিধি কতটুকু হবে। এটি কি কেবল পণ্যের বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এতে সেবা খাত (যেমন- ব্যাংকিং, পর্যটন), বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং মেধাসম্পদ (Intellectual Property) অধিকারও অন্তর্ভুক্ত থাকবে? এই আলোচ্যসূচি চূড়ান্ত হওয়ার পরই শুরু হয় মূল লড়াই বা ‘নেগোসিয়েশন’।

​তৃতীয় ধাপ: কয়েক ধাপের দরকষাকষি বা নেগোসিয়েশন

বাণিজ্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ অংশ হলো নেগোসিয়েশন রাউন্ড। দুই দেশের অভিজ্ঞ কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল কয়েক দফা বৈঠকে বসেন। এই আলোচনায় প্রধানত দুটি বিষয় প্রাধান্য পায়। প্রথমত, কোন কোন পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হবে বা শূন্য করা হবে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। একে বলা হয় ‘পণ্য ছাড়ের তালিকা’।

এরপর অনেক সময় শুল্ক কম থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা বা কঠোর মানদণ্ডের কারণে পণ্য রপ্তানি করা যায় না। এগুলো দূর করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

এখানে ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ বা আদান-প্রদানের নীতি কাজ করে। যেমন- একটি দেশ হয়তো তার কৃষিপণ্যের জন্য বাজার চাইবে, বিনিময়ে অন্য দেশ তার তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা দাবি করবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

চতুর্থ ধাপ: আইনি পরিমার্জন বা লিগ্যাল স্ক্রাবিং

আলোচনার মাধ্যমে যখন একটি সাধারণ ঐকমত্য তৈরি হয়, তখন চুক্তির খসড়াটি আইনি বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। একে বলা হয় ‘Legal Scrubbing’। কারণ, চুক্তির প্রতিটি শব্দের আইনি গুরুত্ব রয়েছে। একটি ভুল শব্দের কারণে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আদালতে দেশ দুটির মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এই পর্যায়ে নিশ্চিত করা হয় যে, চুক্তির ভাষা যেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

​পঞ্চম ধাপ: স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন

খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানরা একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল স্বাক্ষর করলেই চুক্তিটি কার্যকর হয় না। স্বাক্ষর হওয়ার পর চুক্তিটি প্রতিটি দেশের জাতীয় সংসদ বা মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। একে বলা হয় ‘রেটিফিকেশন’ বা অনুসমর্থন। অনেক দেশে বাণিজ্য চুক্তির জন্য বিশেষ আইন পাশেরও প্রয়োজন পড়ে।

​ষষ্ঠ ধাপ: বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ

চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর শুরু হয় বাস্তবায়নের পালা। কাস্টমস বা শুল্ক বিভাগকে নতুন শুল্ক কাঠামো সম্পর্কে অবহিত করা হয়। চুক্তির সুবিধা ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য একটি ‘যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়। যদি চুক্তির কোনো ধারা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়, তবে এই কমিটি তা নিরসনে কাজ করে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার আশ্রয় নেওয়া হয়।

একটি দ্বিদেশীয় বাণিজ্য চুক্তি কেবল কাগজের দলিল নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি। এর মাধ্যমে নতুন বাজার উন্মোচিত হয়, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষ কম মূল্যে উন্নত মানের পণ্য ব্যবহারের সুযোগ পায়। তবে এই চুক্তির সাফল্যের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা এবং উভয় দেশের টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্পাদিত একটি বাণিজ্য চুক্তি একটি উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন