Ridge Bangla

ইতিহাসের ধুলোয় ঢাকা সোনারগাঁয়ের পানাম নগর

ইতিহাস কখনো হঠাৎ হারিয়ে যায় না, তা শুধু নীরব হয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত পানাম নগর তেমনই এক নীরব শহর, যেখানে ইট-পাথরের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে বাংলার গৌরব, বেদনা ও পতনের দীর্ঘ কাহিনি। একসময় বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই নগর আজ দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ সাক্ষী হয়ে- সময়ের কাছে পরাজিত হলেও ইতিহাসের কাছে অমর।

সোনারগাঁও ছিল বাংলার প্রাচীন রাজধানীগুলোর অন্যতম। ঐতিহাসিকভাবে সোনারগাঁও গড়ে উঠেছিল তিনটি নগর নিয়ে- বড় নগর, খাস নগর ও পানাম নগর। এর মধ্যে পানাম নগর ছিল সবচেয়ে পরিকল্পিত ও নান্দনিক। একটি বাঁকানো সেতু পেরিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে লম্বা সোজা রাস্তা, যার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী দালানকোঠা।

ঐতিহাসিকদের মতে, ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়ার নেতা ঈসা খাঁর সময় থেকেই সোনারগাঁও অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর সহজ নৌ-যোগাযোগ পানাম নগরকে করে তোলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। এখানকার ঘাটে ভিড়ত পালতোলা নৌকা, যেখানে লেনদেন হতো মসলিন, রেশম, নীল ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের। বাংলার সূক্ষ্ম মসলিন ইউরোপের রাজদরবারে পৌঁছাত এই পথ ধরেই।

পানাম নগরের স্থাপত্যে ফুটে উঠেছে সময়ের বহুধা প্রভাব। মোগল আমলের খিলান ও কারুকাজের সঙ্গে মিশে আছে ইউরোপীয়, বিশেষ করে গ্রিক ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতি। কোথাও কাস্ট আয়রনের অলঙ্কৃত রেলিং, কোথাও লাল-সাদা মোজাইকের মেঝে, কোথাও আবার উঁচু খিলানযুক্ত বারান্দা। প্রায় প্রতিটি বাড়ির ভেতরে রয়েছে খোলা উঠোন, কূপ, গোপন চলাচলের পথ ও অতিথিশালা। কোনো কোনো ভবনে ছিল নাচঘর ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন, যেখানে একসময় ধ্বনিত হতো রাগ-রাগিণী। আজ সেখানে কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস।

১৬১১ সালে মোগলদের আগমনের পর পানাম নগরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হয়। কিন্তু ইতিহাসের নিয়মে সমৃদ্ধির পাশাপাশি আসে পরিবর্তন। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে গেলে পানাম নগরের চরিত্রও পাল্টাতে থাকে। অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী এলাকা ছেড়ে চলে যান। পরে এখানে বসতি গড়ে তোলেন মূলত হিন্দু সামন্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণি।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পানাম ছিল নীলচাষ ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অবসান, দেশভাগ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পালাবদলের ধারায় পানাম নগর ধীরে ধীরে জনশূন্য হতে শুরু করে। বাসিন্দারা একে একে এলাকা ছেড়ে চলে গেলে নগরটি রূপ নেয় পরিত্যক্ত জনপদে। ভাঙতে থাকে ছাদ, ফাটল ধরে দেয়ালে, গাছের শিকড় গ্রাস করে নেয় ঘরবাড়ি। শ্যাওলায় ঢেকে যায় ইতিহাসের অলঙ্করণ। মানুষের কোলাহল হারিয়ে পানাম পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ভূতুড়ে নগর’ নামে।

তবুও ইতিহাস হারায়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সরকার পানাম নগর সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়। সংস্কার করা হয় সেতু, রাস্তা ও কিছু ভবন। ধ্বংসের মুখে থাকা স্থাপনাগুলোকে স্থিতিশীল করতে নেওয়া হয় কাঠামোগত ব্যবস্থা। পর্যটকদের জন্য পানাম নগর খুলে দেওয়া হলে নতুন করে আলোচনায় আসে এই ঐতিহাসিক শহর।

তবে সংরক্ষণ নিয়ে রয়েছে বিতর্কও। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, অতিরিক্ত বা ভুল সংস্কারে পানামের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, পানামকে ‘নতুন করে সাজানোর’ চেয়ে তার ক্ষতচিহ্নসহ আসল রূপ ধরে রাখাই বেশি জরুরি। কারণ ভাঙা দেয়াল, ক্ষয়ে যাওয়া কারুকাজ- এসবই তো সময়ের সাক্ষ্য।

আজ পানাম নগর কেবল একটি প্রত্নস্থল নয়, এটি একটি জীবন্ত স্মৃতি। চলচ্চিত্র, নাটক ও আলোকচিত্রে বারবার ফিরে আসে এই নগর। ‘গেরিলা’, ‘সুবর্ণগ্রাম’-এর মতো চলচ্চিত্রে পানাম নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত হয়েছে ভিন্ন এক নান্দনিকতায়। ইতিহাস, শিল্প ও প্রকৃতির সম্মিলনে পানাম হয়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক।

This post was viewed: 16

আরো পড়ুন