একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক প্রেক্ষাপটে আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বাংলাদেশ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ায় সামরিক খাতে খুব বেশি ব্যয় করতে পারেনি অনেক বছর ধরে।
এরপরও বাংলাদেশ বিমান বাহিনী (বিএএফ) তার জন্মলগ্ন থেকেই সীমিত সম্পদ নিয়েই সাহসিকতার সাথে আকাশসীমা রক্ষা করে আসছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এবং ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সংযোজিত হতে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সেরা মাল্টি-রোল ফাইটার জেট ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’। এই যুদ্ধবিমানটি কেনাটা সাধারণ কোনো সামরিক কেনাকাটা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা। এটি সামরিক সক্ষমতাকে নিয়ে যেতে পারে এক অনন্য উচ্চতায়।
ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী কৌশলগত এবং ভৌগোলিক কারণ। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ অনুযায়ী বিমান বাহিনীকে একটি আধুনিক ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বিমান বাহিনীর হাতে থাকা এফ-৭ সিরিজের বিমানগুলো তাদের কার্যক্ষমতার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণ এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (MRCA) অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এর ফলেই ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আমাদের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার এবং ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমান বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে মিয়ানমারের সাথে বিগত বছরগুলোতে আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা বাংলাদেশকে আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর হাতে থাকা সুখোই-৩০ বা রাফালের মতো বিমানের বিপরীতে ‘ডিটারেন্স’ বা ‘শক্ত প্রতিরোধ’ গড়ে তুলতে ইউরোফাইটার টাইফুনের মতো শক্তিশালী বিমানের বিকল্প নেই। গত দুই দশকে বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের পর বঙ্গোপসাগরের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য জরুরি। গভীর সমুদ্রে নজরদারি এবং প্রয়োজনে দ্রুত স্ট্রাইক করার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ইউরোফাইটার টাইফুনের মতো ‘লং রেঞ্জ’ ফাইটার জেট প্রয়োজন, যা দীর্ঘ সময় আকাশে ভেসে থেকে মিশন পরিচালনা করতে পারে।
ইউরোফাইটার টাইফুন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হলে তা আক্ষরিক অর্থেই ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। বর্তমানে বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান হিসেবে মিগ-২৯ এবং এফ-৭ ব্যবহৃত হচ্ছে। টাইফুন যুক্ত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে অন্যতম শক্তিশালী ‘এয়ার সুপিরিয়রিটি’ অর্জন করবে।
এটি এমন একটি বিমান যা ডগফাইটে অত্যন্ত ক্ষিপ্র এবং শত্রুর বিমানকে চোখের পলকে লক করে ধ্বংস করতে সক্ষম। তবে এটি কেবল আকাশযুদ্ধে পারদর্শী নয়, বরং ভূমিতে এবং সমুদ্রে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। অর্থাৎ, একটি মাত্র প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আকাশ রক্ষা, গ্রাউন্ড অ্যাটাক এবং অ্যান্টি-শিপ মিশন- সবই পরিচালনা করতে পারবে। পাশাপাশি এটি অপারেশনাল খরচ এবং লজিস্টিক জটিলতা কমাবে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে ইউরোফাইটার টাইফুন যুক্ত হওয়া মানে পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক এভিওনিক্স, রাডার এবং সেন্সর প্রযুক্তির সাথে বাংলাদেশের পরিচিত হওয়া। এটি আমাদের বৈমানিকদের দক্ষতা এবং ইঞ্জিনিয়ারদের রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে। চীনের প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমিয়ে এটি সামরিক সরঞ্জামের উৎসে বৈচিত্র্য আনবে।
ইউরোফাইটার টাইফুনকে বলা হয় ‘সুইং-রোল’ ফাইটার। অর্থাৎ এটি যুদ্ধের মাঝপথেই তার ভূমিকা পরিবর্তন করতে পারে (যেমন- আকাশ থেকে আকাশে যুদ্ধ করা অবস্থায় তৎক্ষণাৎ ভূমিতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া)। টাইফুনের গঠনশৈলী একে দিয়েছে অসামান্য ক্ষিপ্রতা। এর ডেল্টা উইং এবং সামনের ছোট পাখা বা ‘ক্যানার্ড’ একে বাতাসের বিপরীতে অত্যন্ত দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে সাহায্য করে।
সুপারসনিক গতিতেও এটি অত্যন্ত নমনীয়, যা ডগফাইটে একে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। বিশ্বের খুব কম যুদ্ধবিমানের ‘সুপারক্রুজ’ ক্ষমতা আছে। আফটারবার্নার (জ্বালানি বেশি খরচ করে গতি বাড়ানো) ব্যবহার না করেই এটি শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে (সুপারসনিক) দীর্ঘক্ষণ উড়তে পারে। এর ফলে এটি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে এবং বেশিক্ষণ আকাশে অবস্থান করতে পারে।
এই সুপারসনিক যুদ্ধবিমানটিতে দুটি অত্যাধুনিক ইঞ্জিন থাকায় এর নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি। একটি ইঞ্জিন বিকল হলেও এটি নিরাপদে ফিরে আসতে পারে, যা সমুদ্রের ওপর অপারেশনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এটি প্রায় নয় হাজার কেজি ওজনের অস্ত্র বহন করতে পারে।
টাইফুনের অন্যতম শক্তি হলো এর ‘ক্যাপ্টর-ই’ (Captor-E) বা এআইএসএ রাডার। এটি বহু দূরে থাকা শত্রুর স্টেলথ বা লুকায়িত বিমানকেও শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া এর ‘পাইরেট’ ইনফ্রারেড সেন্সর রাডার ব্যবহার না করেও নীরবে শত্রুকে ট্র্যাক করতে সক্ষম। এই বিমানের সাথে যুক্ত করা যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘মিটিওর’ (Meteor) মিসাইল। এটি দৃষ্টিসীমার বাইরে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে শত্রুর বিমান ধ্বংস করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই মিসাইল গেম চেঞ্জার হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইউরোফাইটার টাইফুন কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়, এটি বাংলাদেশের আকাশসীমার অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক ইস্পাত কঠিন প্রতিজ্ঞা। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ বাস্তবায়নে এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় এই ফাইটার জেটের সংযোজন হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল বিমান বাহিনীর শক্তিই বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার জানান দেবে নতুন করে।