দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরির জন্য একটি বিশাল প্রকল্প পরিচালনা করছিল। তাদের এই গোপন পরিকল্পনাটি ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত। ১৯৪৫ সালে এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তি এবং জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার পৃথিবীকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করায়।
তবে আমেরিকার নেতৃত্ব যখন পারমাণবিক একাধিপত্যের স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই তাদের পেছনে ঘটে গিয়েছিল এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা। এই গোপন প্রকল্পের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যগুলো কমিউনিস্ট বিশ্বের নেতা সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে তুলে দিয়েছিল একদল গুপ্তচর, যা ইতিহাসে ‘ম্যানহাটন নেটওয়ার্ক’ নামে পরিচিত। এই তথ্য পাচারের ফলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র চার বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে তাদের প্রথম পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়। এরই মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধের ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’।
ম্যানহাটন নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আমেরিকার দিক থেকে সবচেয়ে ‘ড্যামেজিং’ গুপ্তচর ছিলেন ড. ক্লাউস ফুকস। একজন জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হলেও তিনি ১৯৩৩ সালে হিটলারের শাসনে দেশত্যাগ করে ব্রিটেনে চলে আসেন এবং ব্রিটিশ দলের সদস্য হিসেবে ম্যানহাটন প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ পান। লস আলামোসের মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পের কেন্দ্রে তার প্রবেশাধিকার ছিল।
ফুকস ছিলেন গভীরভাবে কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী। তার বিশ্বাস ছিল, পারমাণবিক প্রযুক্তি কেবল আমেরিকার হাতে থাকলে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং মানবতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই আদর্শগত তাগিদ থেকেই তিনি নিয়মিতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের হাতে প্রকল্পের নকশা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের তথ্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যাট ম্যান’ বোমার ‘ইমপ্লোশন কৌশল’-এর বিস্তারিত গাণিতিক সমীকরণ তুলে দেন। তার দেওয়া তথ্যগুলো সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের কয়েক বছর সময়ের অপচয় হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
ম্যানহাটন প্রজেক্টের চারপাশে বিস্তৃত গুপ্তচর নেটওয়ার্কের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘রোজেনবার্গ নেটওয়ার্ক’। এর নেতৃত্বে ছিলেন আমেরিকান দম্পতি জুলিয়াস এবং ইথেল রোজেনবার্গ। যদিও জুলিয়াস রোজেনবার্গ নিজে বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং কমিউনিস্ট দলের সদস্য। তার মাধ্যমে যে তথ্যগুলো সোভিয়েতদের হাতে পৌঁছাত, তার মূল উৎস ছিলেন জুলিয়াসের শ্যালক ডেভিড গ্রিনগ্লাস।
ডেভিড গ্রিনগ্লাস নিউ মেক্সিকোর লস আলামোস ঘাঁটিতে একজন যান্ত্রিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এবং আদর্শগতভাবে প্রভাবিত হয়ে গ্রিনগ্লাস তার হাতে আসা প্রযুক্তিগত স্কেচ এবং ব্লু প্রিন্টগুলো জুলিয়াসের মাধ্যমে সোভিয়েতদের কাছে পাচার করতেন। এই নেটওয়ার্কটির তথ্য ফুকসের দেওয়া তথ্যের তুলনায় কিছুটা কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কমিউনিস্ট অনুপ্রবেশ নিয়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। ১৯৫৩ সালে রোজেনবার্গ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকায় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুদন্ড।
ম্যানহাটন প্রজেক্টের আরেকজন গুপ্তচর ছিলেন থিওডোর হল, যিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়া এক বিস্ময়কর তরুণ পদার্থবিদ। তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে লস আলামোসে নিয়োগ পান এবং ‘ফ্যাট ম্যান’ বোমার ডিজাইন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ক্লাউস ফুকসের মতো থিওডর হলও মনে করতেন, পারমাণবিক ক্ষমতার একাধিপত্য বিশ্বের জন্য বিপদ। তিনি এবং তার বন্ধু ফ্রাঙ্ক ওয়ার্কস নিয়মিতভাবে সোভিয়েতদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতেন। যদিও হলের নাম বছরের পর বছর ধরে গোপন ছিল, কিন্তু পরে ‘ভেনোনা প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে তার ভূমিকা নিশ্চিত হয়। হলকে কখনও বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি এবং তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করে গেছেন।
গুপ্তচরদের এই নেটওয়ার্ক সরাসরি ধরা পড়েনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক বার্তাগুলোকে গোপনে ‘ভেনোনা প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে ইন্টারসেপ্ট ও ডিক্রিপ্ট করতে শুরু করে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে এই বার্তাগুলোর অর্থোদ্ধার হওয়ার পর ১৯৫০-এর দশকে ক্লাউস ফুকস এবং রোজেনবার্গ নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। এই ডিক্রিপ্ট করা বার্তাগুলোই ছিল গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ম্যানহাটন নেটওয়ার্কের সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞানীদের বিশ্বাসঘাতকতা কেবল প্রযুক্তিগত ব্যাপারে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথের ওপর এক বিশাল প্রভাব বিস্তার করার ঘটনা। এই গুপ্তচরবৃত্তির ফলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয় এবং বিশ্বের ক্ষমতা এককেন্দ্রিক না হয়ে দ্বিমেরু ক্ষমতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঘটনা আমেরিকা জুড়ে কমিউনিস্টবিরোধী আতঙ্কের জন্ম দেয়।