বর্তমানে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি অফিস, বিনোদন, ব্যাংকিং, কেনাকাটা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্মৃতিরও প্রধান ভাণ্ডার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় দামী স্মার্টফোন কিনে মাত্র এক-দুই বছরের মধ্যেই সেটি ধীরগতির হয়ে যায়, ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় বা নানা হার্ডওয়্যার সমস্যা দেখা দেয়।
অধিকাংশ সময় এর পেছনে বড় কারণ থাকে ভুল ব্যবহার আর অযত্ন। বিশেষ করে চার্জ দেওয়ার অভ্যাসে সামান্য অসচেতনতা ফোনের ব্যাটারি ও অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশের আয়ু বেশ কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই স্মার্টফোন লম্বা সময় ভালো রাখা সম্ভব।
স্মার্টফোনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো এর ব্যাটারি। আধুনিক ফোনে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নির্দিষ্ট চার্জিং সাইকেলের ওপর কাজ করে। প্রতিবার সম্পূর্ণ চার্জ ও সম্পূর্ণ ডিসচার্জ একটি সাইকেল হিসেবে গণ্য হয়। যত বেশি সাইকেল সম্পন্ন হয়, ব্যাটারির কর্মক্ষমতা তত কমতে থাকে। তাই অনেকেই না বুঝেই প্রতিদিন ফোনের আয়ু কমিয়ে ফেলছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোনের ব্যাটারি ১০০ শতাংশ চার্জ করা সব সময় প্রয়োজনীয় নয়। দীর্ঘ সময় ফুল চার্জে রেখে দিলে ব্যাটারির সেলগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা ধীরে ধীরে ব্যাটারির স্বাস্থ্য নষ্ট করে। আদর্শভাবে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চার্জ হলেই ফোন চার্জার থেকে খুলে নেওয়া ভালো। এতে ব্যাটারি তুলনামূলক কম চাপের মধ্যে কাজ করে এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
একইভাবে, ব্যাটারি একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা ব্যাটারির জন্য ক্ষতিকর। অনেকেই ফোন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত চার্জ দেন না, যা ব্যাটারির আয়ু কমিয়ে দেয়। চার্জ ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে এলেই ফোন চার্জে বসানো সবচেয়ে নিরাপদ। নিয়মিত গভীর ডিসচার্জ ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
চার্জ দেওয়ার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের অভ্যাস বিছানা, বালিশ বা সোফার ওপর ফোন রেখে চার্জ দেওয়া। অথচ চার্জের সময় ফোন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা গরম হয়। নরম কাপড়ের ওপর রাখলে সেই তাপ বের হতে পারে না, ফলে ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে ভেতরের সার্কিট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সব সময় শক্ত ও সমতল জায়গায়, যেমন টেবিল বা ডেস্কের ওপর ফোন রেখে চার্জ দেওয়াই নিরাপদ।
চার্জে বসানো অবস্থায় ফোন ব্যবহার করা সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাসগুলোর একটি। চার্জের সময় গেম খেলা, ভিডিও দেখা বা দীর্ঘক্ষণ কথা বললে ফোন দ্রুত গরম হয়ে যায়। এতে ব্যাটারি ফুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, এমনকি চরম ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। দ্রুত চার্জের প্রয়োজন হলে ফোন বন্ধ করে বা ‘এয়ারপ্লেন মোড’ চালু রেখে চার্জ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
চার্জারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। অনেকেই কম দামে বাজার থেকে নকল বা নিম্নমানের চার্জার কিনে ব্যবহার করেন। এসব চার্জারে ভোল্টেজ ওঠা-নামা করে, যা ফোনের চার্জিং আইসি বা মাদারবোর্ড নষ্ট করে দিতে পারে। ফোনের সঙ্গে দেওয়া আসল চার্জার অথবা কোম্পানি অনুমোদিত চার্জার ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ। এতে চার্জিং স্থিতিশীল থাকে এবং ফোনের ক্ষতির ঝুঁকি কমে।
চার্জিং পোর্টের যত্ন নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়ো করে বা জোরে চার্জার পিন ঢোকালে পোর্ট ঢিলা হয়ে যেতে পারে। এতে চার্জ ঠিকমতো না হওয়া বা কানেকশন সমস্যার সৃষ্টি হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহারে চার্জিং পোর্টে ধুলোবালি জমে যেতে পারে। নরম ব্রাশ বা শুকনো বাতাস দিয়ে সময় সময় পোর্ট পরিষ্কার রাখলে এই সমস্যা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
বিদ্যুৎ সংযোগের দিকেও নজর রাখা জরুরি। ঢিলা, পুরনো বা ত্রুটিপূর্ণ প্লাগ পয়েন্টে ফোন চার্জ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এতে স্পার্কিং হয়ে শর্ট সার্কিট ঘটতে পারে, যা ফোনের মাদারবোর্ড পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম। যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল, এমন প্লাগ পয়েন্টে ফোন চার্জ দেওয়াই নিরাপদ।
ব্যাটারির পাশাপাশি ফোনের সফটওয়্যার ব্যবহারের অভ্যাসও ফোনের স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলে। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ইনস্টল করা, ব্যাকগ্রাউন্ডে অযথা অ্যাপ চালু রাখা কিংবা নিয়মিত আপডেট না দেওয়া ফোনকে ধীরগতির করে তোলে। তাই প্রয়োজন ছাড়া অ্যাপ ইনস্টল না করা, সময়মতো সফটওয়্যার আপডেট দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় ফাইল পরিষ্কার রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনের যত্ন মানে শুধু বাহ্যিক কভার ব্যবহার নয়; বরং ব্যাটারি ও অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশকে সচেতনভাবে ব্যবহার করাই আসল যত্ন। ফোন কতদিন ভালো থাকবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে ব্যবহারকারীর অভ্যাসের ওপর। একটু সচেতন হলেই ফোনের কর্মক্ষমতা দীর্ঘদিন অটুট রাখা সম্ভব।