বাংলা সাহিত্যের অগ্রদূত মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী আজ (২৫ জানুয়ারি)। ১৮২৪ সালের এই দিনে যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদীর তীরবর্তী সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত দত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। জন্মের দুই শতাব্দী পেরিয়েও তিনি বাংলা সাহিত্যজগতে অমর হয়ে আছেন। তাঁর জন্মস্থান সাগরদাঁড়ি আজ কবি ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থভূমি।
মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান ‘মধুপল্লী’ স্থানটি কেবল সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়। প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ দর্শনার্থী টিকিট কেটে মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখেন। তবে বিপুল সম্ভাবনার মধ্যেও মধুপল্লী এখনও পুরোপুরি পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। পর্যটন অবকাঠামো ও পরিকল্পিত উন্নয়নের অভাবে এই স্থান কাঙ্ক্ষিত পর্যটন অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
মাইকেল মধুসূদনের পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ও মা জাহ্নবী দেবী ছিলেন সাগরদাঁড়ির সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ছোটবেলায় তিনি পাশের শেখপুরা গ্রামে মৌলভী খন্দকার মখমলের কাছে বাংলা ও ফার্সি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮৩৩ সালে সাগরদাঁড়ি ছেড়ে কলকাতার খিদিরপুরে চলে যান এবং লালবাজার গ্রামার স্কুলে ইংরেজি, ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষা অধ্যয়ন করেন। ১৮৩৭ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ন শুরু করেন।
১৮৪২ সালে ‘স্ত্রী শিক্ষা’ বিষয়ে ইংরেজিতে প্রবন্ধ লিখে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। পরের বছর ৯ ফেব্রুয়ারি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর বিশপস কলেজে ভর্তি হয়ে গ্রিক ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। ভাগ্যান্বেষণে তিনি মাদ্রাজে গমন করেন। সেখানে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলেও সুস্থ হয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। একই সময় বিভিন্ন পত্রিকায় ছদ্মনামে কবিতা রচনা ও সাংবাদিকতা করেন। সেই বছরই তিনি রেবেকা ম্যাকটাভিসকে বিয়ে করেন।
মাইকেল মধুসূদনের প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য কাপটিভ লেডি’ ১৮৪৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাই স্কুল বিভাগে শিক্ষকতা, দৈনিক স্পেকটেটর পত্রিকায় সহ-সম্পাদক এবং আদালতে দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৮৫৮ সালে রচিত ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করেন। এরপর ‘পদ্মাবতী নাটক’, বাংলা ভাষার প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ এবং ১৮৬১ সালে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে মহাকবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় তার জীবনাবসান ঘটে। মধুসূদনের পৈতৃক বাড়ি সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত। কবির বাড়ি, কাচারিঘর, মন্দির এবং স্বজনদের বাড়িসহ পুরো এলাকায় এখন একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। বাড়িতে সংরক্ষিত আছে কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, হাতে লেখা চিঠি, আসবাবপত্র, পারিবারিক ছবি এবং দেশ-বিদেশের আলোকচিত্র।
মধুপল্লীর কাস্টডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান জানান, প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক মধুপল্লী ভ্রমণে আসে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় অবকাঠামো উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ বছর মহাকবির জন্মবার্ষিকীতে ঐতিহ্যবাহী মেলা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মধুপল্লীর উদ্যোগে জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।